শিকল
ভটচায মশাই সদ্য বাড়ির সদর দরজায় পা টা রেখেছেন,সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নেমে কে যেন ওনার পাশ দিয়ে ধুপধুপ করে বেড়িয়ে গেলো চোখের নিমেষে ।আর ওপর থেকে অনেক পুরুষ ও মহিলা কন্ঠ শোনা গেলো সমস্বরে- " ধর ধর,ওরে কে কোথায় আছিস? সব্বোনাশ হয়ে গেল রে ।" সবার ওপরে দত্ত গিন্নির গলা- ওরে সব গেল রে,সব গেল । কি হয়েছে ভটচায মশাই বুঝতে না বুঝতেই পাড়ার কেউ একজন ধরে নিয়ে এলো তাকে ।যার জন্য বাড়ির সবাই উতলা,তার কোনো হেলদোল নেই । অত্যন্ত মোটা সোটা হোৎকা চেহারা ।পরণে হাফপ্যান্ট ও গেঞ্জি পরা ।দৃষ্টিতেই বোঝা যায় প্রকৃতিস্থ নয় সে ।বছর পয়ত্রিশ এর যুবক সে ।সবাই ধরে আবার তিনতলার কোণের ঘরে বন্দী করল তাকে ।অবশ্যই শিকল দিয়ে বেঁধে ।
হ্যাঁ,শিকল দিয়ে বেঁধেই রাখতে হয় তাকে ।কারণ,জন্মাবধি সে যে অপ্রকৃতিস্থ ।সাধারণে যাকে পাগল বলে ।ভটচায মশাই এর অজানা নয় এ কথা ।তিনি এ বাড়ির পুরোহিত-মশাই দীনু পুরোহিত ।আজ অনেকদিন হয়ে গেল তাঁরা বংশ- পরম্পরায় এ বাড়িতে পৌরহিত্য করেন ।সে অনেক কাল আগের কথা ।তাঁর দাদুর সময় থেকেই তাঁরা এ বাড়িতে পুজো-পাঠ করেন ।এ বাড়িরই একজন হয়ে গেছেন তাঁরা ।
উত্তর কোলকাতার মদনমোহন তলায় এই দত্ত বাড়ি ।সামনেই বড় রাস্তা বাগবাজার স্ট্রিট । দত্তরা সুবর্ণ বণিক ।বেশ ধনী বলা চলে ।এখানেই পুজো করেন দীনু পুরোহিত ।রোজ সকাল আটটার সময় উনি আসেন পুজো করতে ।বাড়িতে নারায়ন শীলা প্রতিষ্ঠা করা আছে ।রোজ তিনি নারায়ন ও অন্যান্য দেব-দেবীর সেবা দিতে আসেন।তারপর কিছুক্ষণ বসে,জলযোগ সেরে বাড়ি ফেরেন ।পুজো-পার্বণে এখানেই ঠাকুরের ভোগ গ্রহণ করেন ।তাই তিনিও এই পরিবারেরই একজন সদস্য তুল্য ।আর নাড়ি-নক্ষত্র সবই জানেন এই পরিবারের ।
দত্ত গিন্নির তিন ছেলে ।দত্ত-মহাশয় দেহ রেখেছেন অনেক দিন হলো ।ছেলেরা সব প্রতিষ্টিত ।তিন ছেলের ছেলে মেয়েরা ও সব দাঁড়িয়ে গেছে ।কেবল দত্ত গিন্নির অত ঐশ্বর্যের মধ্যে ও,চাঁদে কলঙ্কের মতো একটাই ক্ষোভ তার সবচেয়ে ছোটো নাতি জন্ম থেকেই স্বাভাবিক নয় । প্রথম থেকে কেউ বোঝে নি ।অনেক ডাক্তার-বৈদ্য,ঠাকুর-দেবতা,কবজ-তাবিজ সব করেছেন এরা ।কিন্তু ফল হয়নি কোনো ।তাই তাকে একটি ঘরে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হত ।কখন কি বিপদ ঘটে সেই ভয় ।এইভাবে বেড়ে ও ওঠে সে ।প্রথম প্রথম তার মা-ই সব করত ।কিন্তু আসতে আসতে তাকে দেখবার জন্য তাদেরই বহু পুরনো ,বিশ্বস্ত একটি চাকর তার জন্য বহাল হলো ।সেই সবকিছু দেখভাল করে । সবার ওপরে গৃহকর্ত্রী দত্ত গিন্নি ।বয়স হলে ও তার ছোট নাতির ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিলো তার ।কারোর অবজ্ঞা করার ক্ষমতা ছিলো না ।আদর করে নাম রেখেছিলেন গোপাল ।গোপাল যেন সত্যি দেখতে গোপালের মতোই ।
গোপাল যখন বয়স পঁচিশ হলো,তখন দত্ত গিন্নির সাধ হলো নাতির বিয়ে দেবেন ।কথায় বলে,বড়লোকের সাধ ।সে কী অপূর্ণ থাকে!যেমন কথা তেমন কাজ ।চারিদিকে পাত্রীর খোঁজ নেওয়া শুরু হলো । ভুরিভুরি পাত্রীর বাবারা আসতে থাকলেন ।পাত্রের ঠাকুমা খুব খুশী ।বললেন," সোনার আংটি আবার বেঁকা ।" তার ওপর বড় লোকের নন্দ দুলাল ।অবশেষে এদের পছন্দ হলো--ধনেখালির এক প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ে ।অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার ।আর সব জেনেই মেয়ের বাপ দিলেন বিয়ে ।বয়স পনেরো,লাল টুকটুকে রাঙা বৌ এলো কোলকাতার এক বনেদি পরিবারে এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ।আলতায় পা-ডুবিয়ে ঢোকার সময় থেকেই শুনতে হলো আমাদের গোপালকে যত্নে রাখবে ।যে মেয়েটি সেই সময় না বোঝে ভালো করে বিয়ের অর্থ,না দেখেছে তার অপ্রকৃতিস্থ স্বামীকে ।কিন্তু বিরাট দায়িত্বের বোঝা চেপে গেলো তার অজান্তেই তার ছোট্ট কাঁধে ।
দত্ত গিন্নি ও পরিবারের সবাই বেজায় খুশী এই বিয়েতে ।কিন্তু অবুঝ গোপাল,সে তো কিছুই বুঝ্লো না,তার জীবনের এই বিরাট পরিবর্তন ।একটি সুন্দর,নিষ্পাপ মেয়ে এসে জুড়ে গেলো তার জীবনে ।গোপালকে এতো যত্ন বোধহয় এর আগে কেউ করেনি ।তার যত রকম পাগলামি সব মুখ বুঝে সহ্য করত তার জীবন সঙ্গিনীটি ।এমনকি কখনো কখনো তার স্বামী না বুঝেই তাকে শারীরিক আঘাত করত ।নীরবে সে তাও সহ্য করত ।
আর এই ছোট্ট বৌ মিনু আসার পর থেকে গোপালকে শিকলে বেঁধে রাখতে ও হত না ।অবোধ গোপালের ও হয়তো ভালো লাগত ।শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকতে কার ভালো লাগে!মিনু তার জীবনের সব ভালোটুকু দিয়ে তার পরম- প্রিয়র সেবা করত ।দুর্ভাগ্যবশত: সেই দিনই গোপাল কিভাবে যেন মুক্তির বাসনায় রাস্তায় বেড়িয়ে গেছিল ।আর মিনু?? সেদিনের সামান্য তার চোখের আড়ালে ঘটে যাওয়া ভুলের জন্য যে পরিমাণ তিরস্কৃত হয়েছিল,প্রাণ থাকতে তা ভুলবে না সে।তার সেবার প্রাপ্তি সে কেনো চাইবে ।সে যে তার প্রিয়ের সেবা করে ।এই পাগল স্বামীকে সে তার মন,প্রাণ দিয়ে আগলে রাখে,শিকল দিয়ে নয় ।কিন্তু এই কঠিন শিকলে বাঁধা মনের খবর কেউ রাখত কি??
Bhalo laglo
ReplyDeleteখুব ভাল লাগলো।
ReplyDeleteখুব ভালো লাগলো বৈশালী। কি সুন্দর লিখিস তুই। আরও লেখার অপেক্ষায় রইলাম।
ReplyDeleteখুব ভালো লাগলো বৈশালী । কি সুন্দর লিখেছিস তুই।আরও লেখার অপেক্ষায় রইলাম -- সুমনা।
ReplyDeleteঅসাধারন লিখেছো দিদি-- মিষ্টি
ReplyDeleteঅসাধারণ
ReplyDeleteবেশ লাগলো,চোখে জল এলো
ReplyDelete