পিতৃ-স্নেহ


 
অনীক হালদার আর সুমি হালদার,একই কর্পোরেট অফিসে চাকরি করে ।দুজনেই ইঞ্জিনিয়ার ।বেশ ভালো পোস্টেই আছে দুজন ।বাড়ি থেকে দেখে শুনেই বিয়ে হয়েছে ।ভারি সুন্দর মানিয়েছে দুজনকেই ।অনীক প্রায় ছ ফুটের কাছে কাছে লম্বা ।দোহারা চেহারা ।সুমি ও হাল্কা ছিপছিপে,সুন্দর লম্বা একটি বেণী করে হালকা সিফন শাড়ী পরে যখন অফিসে ঢোকে অনেকেরই চোখ চলে যায় ওর দিকে ।তেমনি মিষ্টি স্বভাবে ও ।ডানদিকের টেবিলে বসে সঞ্জয় কখনো কখনো বলেই ফেলে সুমিকে," বাহ!বেশ লাগছে কিন্তু আপনাকে ।"সুমি স্বলজ্জ হাসি হাসে ।সুন্দর দিন কাটেসুমি-অনীক এর ।ওরা দুজন কোলকাতার গড়িয়ায় একটি দু কামরার সুসজ্জিত ফ্ল্যাট এ থাকে ।ফেরে একই সঙ্গে ।ফিরে দুজনে চা খেতে খেতে গল্প করে ।তারপর রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ার পালা ।এক একদিন অনীক সুমির সুন্দর চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলে,"ভগবান কি তোমাকে আমার জন্যই সৃষ্টি করেছিলেন সুমি "? সুমি উত্তর না দিয়ে মন প্রাণ দিয়ে উপভোগ করে তার স্বামীর ভালো বাসা ।এইরকম ভীষণ হাসিমজায় এক বছর দেখতে দেখতে কেটে গেলো ।অফিসেও সবাই বোঝে সুমিঅনীক এর এই ভালোবাসার রসায়ন খুব সুন্দর ।
   একদিন অফিস থেকে ফিরে সুমি বুঝতে পারে তার শরীরে অন্য এক প্রাণের স্পন্দন ।তাই হয়তো কিছু শারীরিক অস্বস্তি অনুভব করে ।অনীক ও ব্যস্ত হয়ে ওঠে ।পরের দিনই শত ব্যস্ততায় দুজনেই ছুটি নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে যায় ।আর ডাক্তার সুমির অনুমানকে সঠিক বলেন ।দুজনে আনন্দে হোটেলে খেয়ে সুখ সাগরে ভাসতে ভাসতে বাড়ি ফেরে ।এরপর ঠিক সময় সুমি একটি ছোট্ট সুন্দর ফুটফুটে কন্যা সন্তান উপহার দেয় অনীককে ।ওদের দুজনের মধ্যে আর এক অন্যতম খুশী এসে যোগ দেয় ।অনীক আর সুমির বাড়ির লোকজন তো খুবই খুশী ।অফিস থেকে ফিরে অনীক হাত পা না ধুয়েই নিয়ম বিরুদ্ধভাবেই মেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করতে থাকে ।সুমির কোনো কথাই আমল দেয় না সে ।নাম রেখেছে মিঠি ।সেও যেনো অপেক্ষা করে কখন অনীক আসবে ।আনন্দে আত্মহারা হয়ে হাত পা ছুড়ে সে খেলা করবে দেদার ।দেখতে দেখতে একবছরে পা দিল মিঠি ।এখন সে কথা ও বলে একটু একটু ।মাম-মা,বাব-বা ।খাব,যাব ।টুকটাক ভালই আদো আদো কথা বলে ।সারাদিন পর যখন অনীক-সুমি ফেরে অফিস থেকে তখন আর তাকে পায় কে! তার ঠাম্মী পেছন পেছন দৌড়ে ও কিছু করতে পারেন না ।এখন মিঠির গল্প সুমির অফিসে সবার মুখে মুখে ।অনীক তো সবসময় মোবাইলে তার মিঠির সঙ্গে কথা ।অনীকের বস তো সেদিন বলেই বসলেন-"মি:হালদার আপনাকে বাড়িতে কখনো মোবাইলে কথা বলতে দেখিনি ।মেয়ে তো আপনাকে পুরো বদলে দিল ।বলে হাসতে লাগলেন ।"এইভাবেই বেশ ।কিন্তু এটা বোধহয় সত্যি,সুখ চিরকাল থাকে না ।আবার দু:খের পর সুখ আসে ।
    মিঠি যখন তিনবছরের তখন অনীক ক্যান্সারে আক্রান্ত হলো ।আর শেষ পর্যায় ধরা পরলো ।তাই কাউকে সময় না দিয়ে সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলো সে ।এক নিমেষে সব সুখটুকু চলে গেলো সুমির জীবন থেকে ।সে পাগল হয়ে গেলো ।শুধু মিঠির কথা ভেবে সে জীবন্মৃত অবস্থায় বেঁচে রইলো ।মিঠি রোজই জিগ্গাসা করে," মাম,বাবাই কখন আসবে কতদিন তো ট্যুরে গেছে?"এক বুক কান্না নিয়ে সে বলে মেয়েকে কিছুদিন পর ।চরম মিথ্যে বলে,সে নিজেকে সামলাতে পারে না ।অফিসের সবাই সুমির কষ্ট ভীষণভাবে উপলব্ধি করে ।পাশের টেবিলের সঞ্জয় খুব পাশে থাকে সুমির ।অনুভব করে মিঠি আর সুমির কষ্ট ।তাই সে প্রায়:ই যায় মিঠির কাছে খেলনা,চকোলেট নিয়ে ।মিঠি ও যেনো সঞ্জয় আঙ্কেলকে পেয়ে খুব খুশী ।অফিসের সবাই ও সমর্থন করে সঞ্জয়ের এই পাশে থাকাকে ।এই ভাবেই দিন কাটছিলো ।একদিন সুমির বাবা,মা আর অনীকের পরিবার এবং অফিসের সবাই প্রস্তাব দিল সুমি-সঞ্জয় বিয়ে হোক ।সুমি রাজি হচ্ছিল না ।কারণ অনীকের জায়গায় ও কাউকে বসাতে পারছিল না ।কিন্তু সঞ্জয়ের মধ্যে মিঠি যেনো তার হারানো পিতৃ স্নেহ খুঁজে পেত ।তাই মিঠির আনন্দই যেনো সুমির আনন্দ ।অনীকের আনন্দ ।তাই সুমি সঞ্জয় এক হলো ।মিঠি পেলো তার বাবাই এর ভালোবাসা ।আর অনীক?সে ও অলক্ষ্যে খুশী হলো তো!

Comments