বিচ্ছেদ ।
ভোর পাঁচটা ।চার্চ থেকে প্রার্থনা সেড়ে সোজা গঙ্গার দিকে হাঁটতে লাগল সুচরিতা ।ইচ্ছে,সদ্য ভোরের গঙ্গার শীতল হাওয়া গায়ে লাগানো ।তার সঙ্গে শান্ত মনকে একটু অনুভব করা ।ভারি সুন্দর লাগে তার এই জায়গাটা ।প্রায় প্রত্যেক দিনই চার্চে প্রথম প্রার্থনা করে সে এসে গঙ্গার ধারে একটু হাওয়া খায় ।খুব ভালো লাগে তার ।কত কথা মনে পরে ।নির্জনে একাকী ফেলে আসা জীবনের অনেক কথা মনে করে বসে বসে সুচরিতা ।তারপর সে উঠে পড়ে ।পা বাড়ায় হস্টেলের দিকে ।হ্যাঁ,চার্চের উল্টোদিকেই বড়ো মিশনারি স্কুলটাই যে তার এখন স্থায়ী ঠিকানা ।
ব্যান্ডেল চার্চ-এ এলে এমনিই মন ভরে যায় ।প্রভু যীশু মাতা মেরির কোলে ।বিরাট শান্ত প্রার্থনা হলে বসে বসে অনেকক্ষণ সে প্রার্থনা করে ।কি পরম শান্তি আসে তার মনে ।জীবনের সবকিছু যেন ওঁনার পায়ে সমর্পণ করে শান্তি পেয়েছে সে ।আজ গঙ্গার ধারে বসে সুচরিতা ভাবে প্রভু তাকে এখানে এনে ভালোই করেছেন ।কিন্তু আমরা এবার দেখি সুচরিতার ফেলে আসা জীবন ।সেখানে আজকের সুচরিতা আছে কিনা দেখি তো?
আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে ।কোলকাতার একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে আনন্দের পরিসীমা ছিলো না ।জন্মেছিলো তাদের একটি কন্যা সন্তান ।সবার বড় আদরের ।দাদু আদর করে নাম রেখেছিলেন সুচরিতা ।সবাই "সু " বলেই ডাকত ।সুচরিতা সত্যিই যেনো সুচরিতা ।ভারি সুন্দর কথা বলত সে ।সে যখন এতোটুকু খুকী,মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে মন ভরিয়ে রাখত সবার ।যৌথ পরিবারে সবার চোখের মণি ছিলো সে ।বাবা,কাকু,জেঠু আর দাদু-ঠাকুমার তো বুকের ধন সে ।আদরে খুশীতে বেড়ে উঠছিলো সুচরিতা ।জীবনের নিয়মে স্কুলের গণ্ডী পেরিয়ে কলেজে ভর্তি হলো সে ।ছাত্রী হিসাবে মন্দ ছিলো না "সু "।তাই কোলকাতার নামী কলেজে ভর্তি হতে বেগ পেতে হলো না তাকে ।
দাদুর আদরের নাতনিকে বাড়ির গাড়ি ছেড়ে দিত কলেজে ।আবার ছুটির সময় নিয়ে আসত ।এইভাবেই সুন্দর গতিতে এগোচ্ছিল সুচরিতার কলেজ-জীবন ।বাড়ি ফিরেই "কথা বলা "পাখির মতো মিষ্টি কণ্ঠে অনর্গল সব বলা হতো তার প্রাণের বন্ধু দাদুকে ।এইভাবে প্রথম বর্ষ থেকে পা দিল দ্বিতীয় বর্ষে ।অর্থনীতিতে স্নাতক করছিল সুচরিতা ।এই সময়ে তার জীবনে এলো তারই সহপাঠী অনির্বাণ ।একই ক্লাসের সে ।ছাত্র সে অত্যন্ত মেধাবী ।একে অপরে ভালোবাসার গ্রন্থিতে বাঁধা পরলো ।মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে অনির্বাণ ।সুদর্শন চেহারা ।বাবা একটি সরকারী চাকরি করেন ।মা গৃহবধূ ।কিন্তু জীবনের মূল্যবোধ খুব সুন্দর পরিবারটির ।
সুচরিতার দাদু দেখেন দ্বিতীয় বর্ষে পা দিয়েই নাতনি তার বাড়ির গাড়ি প্রত্যাখ্যান করে নিজেই চলে আসে ।আর সেটাই পছন্দ করে ।বাড়ি ফিরে এখন আর আগের মতো কলকল করে কথা ও বলে না ।বাড়ির সবারই একটু বিসদৃশ লাগে ।এইভাবেই কাটছিল ।কিন্তু কথায় বলে,"মানুষ ভাবে,আর ঈশ্বর তা বানচাল করে দেন "।সুচরিতার দাদু ভাবেন তারা থাকতে থাকতেই তাদের আদরের নাতনির বিয়ে দেবেন ।সেই মতো তোড়জোড় চলে ।কোলকাতার এক ধনী পরিবারের একটি সুযোগ্য পাত্র তারা তাদের "সু "এর জন্য নির্বাচন করেন ।কিন্তু ভীষণ বজ্রাঘাত হলো ।সবার মুখের ওপর সুচরিতা প্রত্যাখ্যান করলো তাদের এই প্রস্তাব ।সে স্পষ্ট জানালো অনির্বাণ ছাড়া অন্য কাউকে মেনে নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয় ।এরপর সে জানালো অনির্বাণকে ।কিন্তু অনির্বাণের বাবা এবং মা তাদের মূল্যবোধকে অনেক বড় করে দেখেন ।তারা জানালেন,সুচরিতার পরিবার থেকে এ বিয়ে মেনে না নিলে তারা মানতে পারবেন না ।আর সুচরিতা এক বিরাট আঘাত পেলো,অনির্বাণ ও তার বাবা,মা এর মতের বাইরে যাবে না ।
সুচরিতা সেই ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া মন নিয়ে প্রথমে নিজেকে শেষ করে দেবার প্রস্তুতি নিল ।কিন্তু সেইসময় হঠাৎ তার সঙ্গে দেখা হয় চার্চের এক সন্ন্যাসিনীর সঙ্গে,যাঁদের আমরা "নান " বলি ।তিনি দিলেন সুচরিতাকে নব জীবন ।তিনি বললেন,যে আমরা সবাই সেই পরম পিতার সন্তান ।তাই তার দেয়া এই অমূল্য জীবন আমরা এইভাবে নষ্ট করতে পারি না ।আমরা ভালো কাজে উৎসর্গ করতে পারি ।সুচরিতা সেইমতো "নান " হয়ে একটি মিশনারি স্কুলে নিজেকে উৎসর্গীকৃত করে পরম শান্তি পেয়েছে ।তার জীবনে অনির্বাণের বিচ্ছেদ তাকে এক অন্য শান্তি দিয়েছে ।
বাঃ খুব সুন্দর
ReplyDeleteঅনেক ভালোবাসা 💖❤
ReplyDeleteBhalo hoiche...
ReplyDeleteBordi bhalo hoiche
ReplyDeleteBhalo hoyeche. 💖🌹💝
ReplyDeleteএত্ত ভালোবাসা 💖❤💖❤💖
ReplyDeleteখুব সুন্দর লিখেছিস রে
ReplyDeleteKhub sundor
ReplyDeleteKhub bhalo hoyeche
ReplyDeleteBesh bhalo hoyechhe re....
ReplyDeleteবেশ সুন্দর লিখেছিস।একটু অন্যরকম।
ReplyDelete